LogoHormuzan

বাংলাদেশে ৬ লাখ চাকরি হারানোর শঙ্কা : বিশ্বব্যাংক

২৯ আগস্ট, ২০২৬6 views
বাংলাদেশে ৬ লাখ চাকরি হারানোর শঙ্কা : বিশ্বব্যাংক
Daily Muktimarg

বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও পড়ছে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের ব্যাপক প্রভাব। জ্বালানির দাম বাড়ার পাশাপাশি গ্যাস সংকটে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, ফলে কমছে সার উৎপাদন। বাড়ছে পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয়। সংকট দীর্ঘ হলে বাংলাদেশে প্রায় ৬ লাখ মানুষ চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারেন বলে আশঙ্কা করছে বিশ্বব্যাংক।

একই সঙ্গে চলতি বছর দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার কথা ছিল এমন মানুষের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে।

বিশ্বব্যাংকের জুনের মাঝামাঝি সময়ের মূল্যায়নে এসব ঝুঁকির কথা বলা হয়েছে। সরকারকে বাজেট সহায়তা দেওয়ার জন্য প্রস্তাবিত একটি প্রকল্পের অংশ হিসেবে মূল্যায়নটি করা হয়। পাশাপাশি চলতি বছর দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার কথা ছিল এমন মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে আশঙ্কা করছে বিশ্বব্যাংক।

বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, শুধু ২০২৫ সালেই দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা আনুমানিক ১৪ লাখ বেড়েছে।

২০২৬ সালে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ না হলে প্রায় ১৭ লাখ মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসতে পারতেন। কিন্তু যুদ্ধের প্রভাবে এ সংখ্যা কমে প্রায় ৫ লাখে দাঁড়াতে পারে। অর্থাৎ যুদ্ধের কারণে দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ হারাতে পারেন আরও প্রায় ১২ লাখ মানুষ।

বিশ্বব্যাংকের মতে, এ বছর দেশে দারিদ্র্য বাড়ার ক্ষেত্রে মূল্যবৃদ্ধির ভূমিকা থাকবে প্রায় ১০ শতাংশ।জ্বালানির বাড়তি দাম ধাপে ধাপে সাধারণ মানুষের ওপর চাপানো হলে মূল্যস্ফীতি শূন্য দশমিক ৫ শতাংশের বেশি বাড়তে পারে। জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন ও বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি শিল্পকারখানার উৎপাদন খরচও বাড়বে। শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব পড়বে খাদ্যসহ বিভিন্ন পণ্যের দামে।

অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী অবশ্য সম্প্রতি বলেছেন, জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের নিচে নেমেছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ না হলে মূল্যস্ফীতি আরও কমত বলেও তিনি মনে করেন।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশের জ্বালানি খাতে। বাংলাদেশের প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহের অর্ধেকের বেশি আসে গ্যাস থেকে। কিন্তু দেশে গ্যাসের উৎপাদন ২০১৬ সালের সর্বোচ্চ উৎপাদনের তুলনায় ১৫ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে আমদানি করা অপরিশোধিত তেলের ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ এবং এলএনজির ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে।

যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার মধ্যে পেট্রোবাংলার ছয়টি এলএনজি সরবরাহ চুক্তির পাঁচটিকে ‘ফোর্স মেজর’ ঘোষণা করা হয়েছে। স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম বেড়ে প্রতি এমএমবিটিইউ ২৪ থেকে ২৮ ডলারে উঠেছে, যা আগের দামের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি। সংকটের মধ্যে সেপ্টেম্বরে সরবরাহের জন্য দুটি এলএনজি চালান কিনতে বাংলাদেশকে প্রতি ইউনিটে ২৪ ডলারের বেশি দিতে হয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জ্বালানি খাতে সরকারের ভর্তুকি জিডিপির ২ দশমিক ৮ শতাংশে উঠতে পারে। সব মিলিয়ে ভর্তুকির চাপ ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন থেকে ৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়াতে পারে। এতে অন্য খাতে সরকারি ব্যয় কমার ঝুঁকি রয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব কর্মসংস্থানে পড়তে শুরু করেছে বলে মনে করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশিষ্ট ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, শিল্পকারখানায় নতুন করে গ্যাস সংযোগ দেওয়া হচ্ছে না। কোথাও কাজের সময় কমানো হয়েছে, আবার জ্বালানি সংকটে কিছু কারখানা বন্ধও হয়ে গেছে।

তাঁর মতে, কারখানা বন্ধ হওয়া ও শ্রমিকদের চাকরি হারানোর সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো পরিস্থিতির গুরুত্ব বোঝাচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের ৬ লাখ চাকরি হারানোর আশঙ্কা সেই বাস্তবতাকেই আরও স্পষ্ট করেছে।

সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বাংলাদেশের জন্য শুধু জ্বালানি সংকট নয়; কর্মসংস্থান, কৃষি, মূল্যস্ফীতি, দারিদ্র্য ও স্বাস্থ্যসেবায় একযোগে চাপ তৈরি করছে। সংকট দীর্ঘ হলে এর বোঝা সবচেয়ে বেশি বহন করতে হবে নিম্নআয়ের মানুষকে।