দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে জন্ম নেওয়া জাতিসংঘের শরণার্থী সনদ ৭৫ বছরে পা দিয়েছে। কোটি কোটি বাস্তুচ্যুত মানুষের অধিকার রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা এই আন্তর্জাতিক চুক্তি এখন নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপজুড়ে ধ্বংসযজ্ঞ ও কোটি মানুষের বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঘটনা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে শরণার্থীদের সুরক্ষায় একটি আইনি কাঠামো তৈরিতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। এর প্রেক্ষিতে ১৯৫১ সালে জাতিসংঘ শরণার্থী সনদ গৃহীত হয়। শুরুতে এটি শুধু ইউরোপের শরণার্থীদের জন্য প্রযোজ্য ছিল। পরে ১৯৬৭ সালের সংশোধনের মাধ্যমে এটি বিশ্বের সব নিপীড়নের শিকার মানুষের জন্য উন্মুক্ত করা হয়।
বর্তমানে ১৪৯টি দেশ এই সনদের অংশীদার। এখন পর্যন্ত কোনো দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে সনদ থেকে বের হয়ে যায়নি। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শরণার্থীদের নিয়ে কঠোর নীতি গ্রহণের কারণে এই চুক্তির কার্যকারিতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বে ৪ কোটি ১০ লাখের বেশি শরণার্থী রয়েছে। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ, সুদানের সংঘাত, ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট, ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলা, মিয়ানমারে রহিঙ্গা এবং বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের যুদ্ধ ও সহিংসতার কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা বেড়েছে।
শরণার্থী সনদ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি নিজ দেশে জাতি, ধর্ম, জাতীয়তা, নির্দিষ্ট সামাজিক গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক মতের কারণে নিপীড়নের বাস্তব আশঙ্কায় দেশ ছাড়তে বাধ্য হন, তবে তিনি শরণার্থী হিসেবে সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার রাখেন। এই সনদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো ‘নন-রিফাউলমেন্ট’—অর্থাৎ কোনো শরণার্থীকে এমন দেশে ফেরত পাঠানো যাবে না যেখানে তার জীবন বা নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে।
সাম্প্রতিক সময়ে অনেক উন্নত দেশই শরণার্থীদের জন্য কঠোর নীতি গ্রহণ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয়প্রার্থীদের ফিরিয়ে দেওয়া এবং কিছু দেশের নাগরিকদের অস্থায়ী সুরক্ষা বাতিলের মতো পদক্ষেপ নিয়ে সমালোচনা হয়েছে। অস্ট্রেলিয়া সমুদ্রপথে আসা শরণার্থীদের আটক কেন্দ্র বা বিদেশি স্থাপনায় পাঠানোর নীতি চালিয়ে আসছে।
ইউরোপের কয়েকটি দেশও সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ কঠোর করেছে। গ্রিস ও পোল্যান্ডসহ কিছু দেশের বিরুদ্ধে শরণার্থীদের সীমান্ত থেকে ফিরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ডেনমার্ক সিরিয়ার কিছু শরণার্থীর বসবাসের অনুমতি বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, এসব নীতি শরণার্থী সনদের মূল চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তারা বলছে, শরণার্থী সমস্যা কোনো একটি দেশের একার দায়িত্ব নয়; বরং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে এই সংকট মোকাবিলা করতে হবে।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বর্তমান সনদেরও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, দারিদ্র্য বা অপরাধপ্রবণতার কারণে যারা দেশ ছাড়ছেন, তারা সবসময় প্রচলিত সংজ্ঞায় শরণার্থীর মর্যাদা পান না।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো, সনদ লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কঠোর আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা নেই। ফলে অনেক দেশ নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ অনুযায়ী এর ব্যাখ্যা করে বা নিয়ম অমান্য করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শরণার্থী সনদে নতুন কোনো সংযোজন বা সংশোধন করা যেতে পারে, তবে এর মূলনীতি মানবিক সুরক্ষা ও নিরাপদ আশ্রয়ের অধিকার অক্ষুণ্ন রাখা জরুরি।
বিশ্বজুড়ে শরণার্থীদের জন্য নিরাপদ ও বৈধ পথও কমে যাচ্ছে। পরিবার পুনর্মিলন, পুনর্বাসন কর্মসূচি ও অন্যান্য বৈধ সুযোগ সীমিত হওয়ায় অনেক মানুষ বাধ্য হয়ে মানব পাচারকারীদের ওপর নির্ভর করছেন।
তবে জনমত পুরোপুরি শরণার্থীবিরোধী নয়। বিভিন্ন দেশের মানুষের ওপর পরিচালিত জরিপে দেখা গেছে, যুদ্ধ ও নিপীড়ন থেকে পালিয়ে আসা মানুষকে আশ্রয় দেওয়ার পক্ষে অনেকেই রয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, শরণার্থী সনদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে বিশ্ব কতটা সহযোগিতার পথ বেছে নেয় তার ওপর। উন্নত দেশগুলো যদি দায়িত্ব কমানোর চেষ্টা করে, তবে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর আরো বেশি চাপ পড়বে।
৭৫ বছর পরও তাই শরণার্থী সনদের প্রয়োজন শেষ হয়নি; বরং মানবিক সংকট বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর গুরুত্ব আরো বেড়েছে।

