পাবনার আটঘরিয়া উপজেলার বারইপাড়া গ্রামের বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে এখন যেন সবুজের বুকজুড়ে সাদা ফুলের এক অপরূপ চাদর। যশোরের আগাম হাইব্রিড জাতের শিমগাছে ফুটেছে অসংখ্য রঙিন ফুল। কোথাও ফুল, কোথাও কচি শিম—প্রকৃতির এমন মনোমুগ্ধকর দৃশ্য দেখতে প্রতিদিনই স্থানীয়দের পাশাপাশি আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ছুটে আসছেন দর্শনার্থীরা। অন্যদিকে আগাম ফলন ও বাজারে ভালো দাম পেয়ে আশার আলো দেখছেন কৃষকরাও।
গতকাল বৃহস্পতিবার সরেজমিনে বারইপাড়া গ্রামের শিমক্ষেত ঘুরে দেখা যায়, সারি সারি মাচাজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে আগাম হাইব্রিড শিমের লতা। ফুলে ভরে থাকা গাছের ফাঁকেই ঝুলছে কচি শিম। কৃষকরা ব্যস্ত সময় পার করছেন ক্ষেতের পরিচর্যায়। কেউ আগাছা পরিষ্কার করছেন, কেউ সেচ দিচ্ছেন, আবার কেউ রোগবালাই দমনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছেন।
এ গ্রামের কৃষক শরিফুল ইসলাম জানান, তিনি সাড়ে তিন বিঘা জমিতে যশোরের আগাম হাইব্রিড জাতের শিমের আবাদ করেছেন। জমিটি চাষাবাদের জন্য প্রায় ৯ লাখ টাকা দিয়ে কট (বন্ধক) নিয়েছেন। জমি প্রস্তুত, মাচা নির্মাণ, সেচ, সার, শ্রমিক ও পরিচর্যাসহ প্রতিনিয়ত ব্যয় বাড়লেও বর্তমান ফলন দেখে তিনি আশাবাদী।
তিনি বলেন, ‘‘এখন গাছে প্রচুর ফুল এসেছে। ইতোমধ্যে শিম সংগ্রহও শুরু করেছি। বর্তমানে প্রতি সপ্তাহে প্রায় আড়াই মণ শিম তুলছি। বাজারে প্রতি কেজি শিম ২৪৫ থেকে ২৬০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবং বাজারদর ভালো থাকলে সব ধরনের উৎপাদন ব্যয় বাদ দিয়ে প্রায় ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা লাভের আশা করছি।’’
স্থানীয় কৃষক মনজুর হোসেন বলেন, ‘‘আগাম জাতের শিম হওয়ায় মৌসুমের শুরুতেই বাজারে এর চাহিদা অনেক বেশি থাকে। সরবরাহ কম থাকায় দামও ভালো পাওয়া যায়। তাই প্রতিবছরই তিনি এবং এ অঞ্চলের অনেক কৃষক আগাম হাইব্রিড শিমের আবাদ করে থাকেন।’’
তিনি আরো বলেন, ‘‘সময়মতো পরিচর্যা, রোগবালাই দমন এবং অনুকূল আবহাওয়া নিশ্চিত করাই আগাম শিম চাষের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তবে সঠিক পরিচর্যা করা গেলে এই চাষে লাভের সম্ভাবনাও অনেক বেশি।
শুধু অর্থনৈতিক দিক থেকেই নয়, বারইপাড়ার ফুলে ভরা শিমক্ষেত এখন প্রকৃতিপ্রেমী ও ভ্রমণপিপাসু মানুষের কাছেও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। সকাল-বিকেল অনেকেই এই নয়নাভিরাম দৃশ্য উপভোগ করতে শিমক্ষেতে ভিড় করছেন।’’
আটঘরিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মাহমুদা মোতমাইন্না বলেন, ‘‘পাবনার ‘শিম সাগর’ দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও পরিচিত। দেশের সবচেয়ে বেশি শিমের আবাদ আটঘরিয়া উপজেলায় হয়। আগাম জাতের শিমগাছে এখন ফুল এসেছে এবং শিম সংগ্রহও শুরু হয়েছে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলার হাটবাজারে যে আগাম শিম পাওয়া যাচ্ছে, তার বড় একটি অংশ আটঘরিয়া ও আশপাশের উপজেলা থেকেই সরবরাহ করা হয়।’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘কম সার ও কম কীটনাশক ব্যবহার করে নিরাপদ উপায়ে আগাম শিম উৎপাদনের জন্য কৃষি বিভাগ নিয়মিত কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দিয়ে আসছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এ বছরও আগাম শিমের ভালো ফলনের আশা করা যাচ্ছে।’’
আগাম হাইব্রিড শিমের বাম্পার ফলন, বাজারে চড়া দাম এবং ফুলে মোড়া নয়নাভিরাম ক্ষেত—সব মিলিয়ে বারইপাড়ার কৃষকদের মুখে এখন স্বস্তির হাসি। প্রকৃতির সৌন্দর্য আর কৃষকের পরিশ্রমে গড়ে ওঠা এই শিমক্ষেত হয়ে উঠেছে উৎপাদন ও সম্ভাবনার এক অনন্য উদাহরণ।

